শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চায় পৃষ্ঠপোষকতা

শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি একেকটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ। যার আলোচনা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। কিন্তু যতই আলোচনা করুন না কেন, মহাসাগরের হারানো নুড়িপাথর পাওয়া যেমন অসম্ভব, তেমনি এর সংক্ষিপ্ত আলোচনাও তার প্রকৃত স্বরূপ উদ্ঘাটন করা যাবে না। এসব কাজ অনেকটাই প্রকৃত গবেষকদের জন্য। গবেষকরাও এ লক্ষ্যে অন্তহীন গবেষণার কাজ নিরলসভাবে চালাচ্ছেন। আসলে মানুষের সহজাত সৃজনশীল মনোভাব থেকেই শিল্প, সাহিত্য সংস্কৃতির উদ্ভব। মনীষীরা কে কী বলেছেন দেখি ঘুরে আসি তাদের জ্ঞানের জগতে।

শিল্প (Art) : শিল্প সম্পর্কে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে জাতীয় অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান বলেছেন, ‘শিল্প হচ্ছে সময়, স্থান বা অন্তরবোধের পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের দৃষ্টিগ্রাহ্যতার একটি প্রতীক।’ দার্শনিক প্লেটোর মতে, ‘আর্ট হচ্ছে অনুভূতির প্রকাশ, অনুকরণ নয়। যে অনুকরণে শিল্পী মনের স্পর্শ নেই তা যান্ত্রিক ব্যাপার মাত্র। অনুসৃত শিল্পকে মানুষ যখন মনের মতো করে মূর্ত করে, তখনই সেটা আর্ট বা চিত্রকলা হয়ে উঠে।’ (১) বর্তমান বিশ্বের প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ আল্লামা ইউসুফ আল কারযাভী বলেন, ‘শিল্পকলা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাবশালী। কারণ তা জাতির হৃদয় ও অনুভূতির সাথে সম্পৃক্ত। শিল্পকলার বিভিন্ন প্রভাব বিস্তারকারী উপাদান দ্বারা যা শোনা যায়, পড়া যায়, দেখা যায়, অনুভব করা যায় কিংবা চিন্তা করা যায়- জাতির দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্বাস গঠনে কাজ করে।’ (২)

সাহিত্য (Literature) : শিল্পকে এককথায় সাহিত্য বলা যায়- মোটকথা ইন্দ্রিয় দ্বারা জাগতিক বা মহাজাগতিক চিন্তা চেতনা, অনুভূতি, সৌন্দর্য ও শিল্পের লিখিত প্রকাশ হচ্ছে সাহিত্য। (৩) সাহিত্য সমালোচক শ্রীশচন্দ্র দাস সাহিত্যের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘নিজের কথা, পরের কথা বা বাহ্য-জগতের কথা সাহিত্যিকের মনোবীণায় যে সুরে ঝংকৃত হয়, তাহার শিল্পসংগত প্রকাশই সাহিত্য।’ (৪) ডা. লুৎফর রহমান সাহিত্যের এ ব্যাপকতাকে লক্ষ্য করে স্মরণযোগ্য একটি মন্তব্য করেছেন। মন্তব্যটি হলো, ‘জীবনের কল্যাণের জন্য, মানুষের সুখের জন্য এ জগতে যিনি যত কথা বলিয়া থাকেন, তাহাই সাহিত্য।’ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, ‘সকলের সহিত মিলেমিশে যা উপভোগ করা যায় তাই সাহিত্য। সাহিত্যে সকল মনের সাহায্য থাকে। সাহিত্যের পাত্র-পাত্রী সবই একটা টাইপ বা নমুনা।’

সংস্কৃতি (Culture) : টিএস ইলিয়টের মতে, ‘সংস্কৃতি হলো বিশেষ স্থানে বসবাসকারী লোকদের জীবন ধারা ও জীবনযাপন পদ্ধতি।’ ইবি টেইলরের মতে, ‘সমাজের সদস্য হিসেবে অর্জিত নানা আচরণ, যোগ্যতা এবং জ্ঞান, বিশ্বাস, শিল্পকলা, নীতি, আদর্শ, আইন, প্রথা ইত্যাদির এক যৌগিক সমন্বয় হলো সংস্কৃতি।’ শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির আজকের দুনিয়ায় দেশ, সমাজ ও বিশ্বের অন্যতম নিয়ন্ত্রক শক্তি। যে যেভাবে পারছেন ব্যাখ্যা, ব্যবহার বা অপব্যবহার ইত্যাদি করছেন। ফলে অনেক সময় শিল্প চর্চার আসল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে।

প্রিয়জন বা পরিচিত কারো সাথে কোথাও দেখা হলে বলেন, ‘কী খবর কবি সাহেব? কেমন চলছে লেখালেখি?’ আবার কেউ বলেন, ব্যবসা কেমন চলছে? কী জবাব দেব, দেয়ার মতো অবস্থায় কি আছে? উত্তর একেকজনের একেক রকম হবে। কবি বা লেখকদের প্রতি সহজাত ভালোবাসা সকলের। কিন্তু এখনও ঠিক জানি না, লেখকদের মধ্যে কতজন লেখালেখিকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন। বলবেন হুমায়ূন আহমেদ আর?… আর গুটিকয়েকজন। বাকিরা কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহলের পদধূলি নিয়ে পথ চলেন। এটাই বাস্তবতা।

যেদেশে দেশ গড়ার কারিগর শিক্ষদের তেমন মর্যাদা নেই, ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক যা তা, সেদেশে লেখকরা তো কিছুই না! মানবতাবাদী কবি ফররুখ আহমেদ অনাহারে মারা গেছেন, কবি আল মাহমুদও খুব একটা ভালো অবস্থায় নেই। বাংলা সাহিত্যের এতবড় কবি হয়েও যার অবস্থা এমন শোচনীয় হবে কেউ বলতে পারে। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন, ‘যে দেশে গুণীর কদর নেই, সে দেশে গুণীর জন্ম হয় না।’- এ কথায় আমরা কজন কান দিই? গুণীর কদর আছে দেশে-সমাজে?

লেখালেখি করছি, চলছে। অনেকে শখের বশে লিখেন। যারা বলেন লেখালেখি কেমন চলছে- তারা লেখার ব্যাপারে আসলে কতটা উৎসাহী বা সহযোগী। সৈয়দ মুজতবা আলী বলেছেন, ‘বই কিনে কেউ দেউলিয়ে হয় না।’ জানার পরও ক’জন পাঠক বই হাতে নেয় বা পাঠের জন্য একটা বই কিনে। বন্ধুরা যদি সবাই সৌজন্য কপির জন্য মনে মনে আশা পোষণ করেন, তাহলে তো হতাশাজনক ব্যাপার হবে। বাস্তবে এমনটাই ঘটে।

প্রতি বছর একুশে বইমেলা হয়ে থাকে ঢাকাকেন্দ্রিক। অথচ পুরো বাংলাদেশে মেলাটা ছড়িয়ে দেয়া প্রয়োজন। অনেক লেখক ঢাকাতেই চলে আসছেন, লেখক হওয়ার জন্য। দেশের কোথাও কোথাও বিচ্ছিন্নভাবে নানা পৃষ্ঠপোষকতায় তা হয়ে থাকে। সাহিত্যচর্চাকে ছড়িয়ে দিতে হবে দেশব্যাপী। একুশ আসলে লেখকদের প্রাণের উচ্ছ্বাসটা বেড়ে যায়, প্রত্যাশা পূরণে চেষ্টা করে কেউ লিখে, মেলায় ঘুরে, ফটোসেশন করে নানা উদ্দেশ্যে। আসলে নিবিড় সাহিত্যচর্চার জন্য যেমন মুক্ত পরিবেশ লাগে, তেমনি প্রয়োজন পৃষ্ঠপোষক। কবি-সাহিত্যিক ও লেখকদের আর্থিকভাবে সহযোগিতা করার জন্য মানবতার বন্ধু মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘কবিদের আর্থিকভাবে সহযোগিতা করা আপন পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের সমতুল্য।’ আর আমরা অনেক সময় জ্ঞানের অভাবে মনে করি ইসলামী সাহিত্যচর্চায় উৎসাহিত করি না বা অনেক সময় বিরোধী মনে করি।

কিছু পৃষ্ঠপোষকতা আমরা দেখতে পাই বাম ঘরানার লোকদের, বিশ্বাসী কবি-সাহিত্যিকদের বেলায় তা সচরাচর দেখা যায় না। বর্তমানে তো আরও নাজুক অবস্থায় আছে তারা। পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে কত প্রতিভা বিকশিত হওয়া সুযোগ পায় না আর কত সত্য-সাধকের লেখা, কলম সৈনিকের মসি আলোর অভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে।

যে কোনো মহৎ কাজ পৃষ্ঠপোষকতা ব্যতীত সম্পন্ন হতে পারে না। সমকালীন মুসলিম শাসকগণ সাহিত্যচর্চায় ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে বলে আমরা পড়েছি। তারা রাষ্ট্র পরিচালনায় কবি-সাহিত্যিকদের যথেষ্ট মূল্যায়ন করেছিলেন। ‘রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে মুসলিম অমাত্যবর্গের অনন্য ভূমিকা ছাড়াও তাদের আরেকটি বড় অবদান হলো, তারা কবি-সাহিত্যিকদের পৃষ্ঠপোষকতা দান করে বাংলা সাহিত্যের ভিত্তিমূল শক্ত করেছিলেন। মূলত খৃষ্টীয় সপ্তদশ শতাব্দীতে মুসলিম প্রভাবিত আরাকান অমাত্যসভায় মুসলমান কবিদের হাতেই বাংলা সাহিত্য পরিপুষ্টি লাভ করেছিল এবং যার ফল বহুমুখী ও দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল। ….পৃষ্ঠপোষকরা যেমন ছিলেন ধার্মিক মুসলমান, তেমনি তাদের পৃষ্ঠপোষক, আশ্রয়দাতা ও আদেশদাতারাও (রাজার অমাত্যবর্গ) ছিলেন একই পথের পথিক।’ (৬) বর্তমানকালেও শাসকগণ পৃষ্ঠপোষকতা নয় কেবল, আনুগত্যের জন্য বিভিন্ন পুরস্কারও প্রদান করে থাকেন।

আজকাল আদর্শ সাহিত্যচর্চায় বেশ প্রতিবন্ধকতা লক্ষ করা যায়। এখনও অনেকেই আছে ধর্মে সাহিত্যচর্চাও হতে পারে বিশ্বাস করেন না। এটা তাদের অজ্ঞতা নাকি অসচেতনতা বলা মুশকিল। সত্যিকার সাহিত্যচর্চা কেবল ধর্মীয় অনুশাসনের ক্ষেত্রেও হতে পারে। বাংলার মুসলমানদের আগমনে বাংলা সাহিত্য উন্নতির চরম শিখরে উপনীত হয়েছিল বলে হিন্দু লেখকরাও কেউ কেউ স্বীকার করেন। ‘মুসলমানদের আগমনে বাংলা সাহিত্যের অশেষ উপকার সাধিত হইয়াছিল।’ (৭) ‘আমাদের বিশ্বাস, মুসলমান কর্তৃক বঙ্গ বিজয়ই বঙ্গভাষায় এই সৌভাগ্যের কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছিল।’ (৮) ‘গত ১ হাজার বছরের ইতিহাসের দিকে তাকালে এবং নিরপেক্ষভাবে তা পর্যালোচনা করলে একথা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়, বাংলা সাহিত্যের উন্নয়ন এবং সমৃদ্ধি ঘটাকে মুসলমান শাসকরা নিঃস্বার্থভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। তাদের পৃষ্ঠপোষকতার কারণেই বাংলা সাহিত্যের বিকাশ ঘটেছে।’ (৯) কিন্তু পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর বাংলা সাহিত্যে মুসলমানদের প্রভাবও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল। এভাবে ভাষা, সাহিত্য ও সাহিত্যচর্চা নানা সময়ে বাধাগ্রস্ত হয়েছে স্বার্থবাদীদের দ্বারা। আরেককটা প্রতিবন্ধকতা লক্ষ করা যায় সাহিত্যচর্চাকে বিভাজনের কারণে। বাংলাদেশ হওয়ার আগে কলকাতার সাথে একটা নিবিড় সাহিত্য সম্পর্ক ছিল। কালক্রমে কলকাতার স্বরূপ উন্মোচিত হওয়ার ফলে বাংলাদেশের ঢাকাকেই সাহিত্যচর্চার পাদপীঠ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেন।

বলছিলাম পৃষ্ঠপোষকতা প্রসঙ্গে, যা ছাড়া সাহিত্যচর্চা এক পাও এগুতে পারে না। আমাদের হীনম্মন্যতাবোধে পেয়ে বসেছে। পত্রিকা-সাময়িকী হরদম বের হচ্ছে, এক, দুই সংখ্যা বের হওয়ার পর আর দেখা যায় না কেন? পৃষ্ঠপোষকতা পায় না, ঠাট্টা, অবহেলার শিকার হন। লিখিয়েদের কাছে লজ্জাবোধটা মনে হয় সবচেয়ে বেশি, কারণ তারা চাইতে পারেন না বা এ ব্যাপারে যথেষ্ট দুর্বলতা আছে। জানলেও চক্ষুলজ্জার কারণে কিছু বলতে পারেন না। তরুণ লিখিয়েদের প্রতি প্রবীণদের আরো বেশি উৎসাহিত হতে হবে। শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চা না থাকলে মানুষ সুসভ্য হয় না। মানুষের প্রতিভা বিকশিত হতে পারে না। গুণীর জন্ম হবে না। সুস্থ সমাজ ও দেশ বিনির্মাণে আমাদের একদল সৎ ও সাহায্যকারী পৃষ্ঠপোষক দরকার। নানামুখী পরিকল্পনা নিয়ে এগুতে হবে, গণসচেতনার মাধ্যমে অপসাংস্কৃতিক দৈত্যকে মোকাবিলা করতে হবে। এ ধরনের ত্যাগের মানসিকতা না থাকলে সাংস্কৃতিক জাহেলিয়াত আরো চেপে বসবে।

প্রামাণ্যগ্রন্থ : ১. শিল্প, সংস্কৃতি ও সভ্যতা- ইব্রাহীম মন্ডল, পৃষ্ঠা : ১৫, ২. ইসলাম ও শিল্পকলা- আল্লামা ইউসুফ আল কারযাভী, ৩. https://bn.wikipedia.org/wiki, ৪. সাহিত্য সন্দর্শন- শ্রীশচন্দ্র দাস, পৃষ্ঠা : ১৭, ৫. আরাকানের মুসলমানদের ইতিহাস- ড. মাহফুজুর রহমান আকন্দ, পৃষ্ঠা : ১৫, ৬. বাংলা নাটকের ইতিহাস- অজিত কুমার ঘোষ, পৃষ্ঠা : ৫, ৭. বঙ্গভাষা ও সাহিত্য- দীনেশ চন্দ্র সেন (ষষ্ঠ সংস্করণ), পৃষ্ঠা : ১১৫, ৮. ইতিহাসের নিরিখে রবীন্দ্র-নজরুল চরিত্র- সরকার শাহাবুদ্দীন আহমেদ।

লেখক : ইদানীং সম্পাদক, কলামিস্ট ও গ্রন্থকার।

২৪বানি/রাশেদুল ইসলাম