ভাঙল ৩২১ কোটি টাকার রাস্তা কাজ শেষ না হতেই

বিশেষ প্রতিনিধিঃ

ভুল নকশায় নির্মাণ করা যশোর-খুলনা মহাসড়কের পালবাড়ী থেকে রাজঘাট অংশের কাজ শেষ হতে না হতেই ভেঙেচুরে গেছে। ৩২১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৩৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এ নবনির্মিত এ সড়কে ‘রাটিং’ সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ ঢেউয়ের মতো উঁচু-নিচু হয়ে ফুলে উঠেছে। সমস্যা সমাধানে ফের পিচ ঢালাই করেও ফল মেলেনি। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নজরে আসায় বিব্রত সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়।

গত ১৩ জানুয়ারি মন্ত্রণালয়ের সড়ক পরিবহন বিভাগের সচিব নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রকল্প পর্যালোচনা সভার সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। এতে বলা হয়েছে, সড়কের নকশা, সমীক্ষা ও উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) ভুল ছিল। এ জন্যই নির্মাণ কাজ শেষ হতে না হতেই মহাসড়কের বেহাল দশা। এ জন্য দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেছে মন্ত্রণালয়। প্রকল্পের ডিপিপি সংশোধন করা হবে। এতে বাড়বে ব্যয় ও সময়।

সভার কার্যবিবরণী সূত্রে জানা গেছে, দুই লেনের যশোর-খুলনা জেলা সড়কের পালবাড়ী থেকে রাজঘাট অংশ চার লেনের জাতীয় মহাসড়কে উন্নীত করা হয়েছে ভুল নকশায়। রাস্তাটি জাতীয় মহাসড়কে উন্নীত হলেও নকশা করা হয়েছে জেলা সড়কের জন্য প্রযোজ্য ‘বাইন্ডার্স কোর্স’ অনুযায়ী। অর্থাৎ, সড়কটির সক্ষমতা রয়ে গেছে জেলা সড়ক পর্যায়েই।

এ ছাড়া প্রকল্পের সমীক্ষায়ও মিলেছে ত্রুটি। রাস্তায় দৈনিক যত গাড়ি (অ্যানুয়াল অ্যাভারেজ ডেইলি ট্রাফিক-এএডিটি) চলাচল করবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছিল, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি যানবাহন চলছে। সড়কে ‘রাটিং’ সৃষ্টির আরেকটি কারণ অতিরিক্ত পণ্যবাহী গাড়ি। এগুলোর চলাচল ঠেকাতে এ সড়কে ‘ওয়ে স্কেল’ নেই।

১৩ জানুয়ারির সভায় প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) কর্মকর্তাদের দায়ও চিহ্নিত করেছে মন্ত্রণালয়। বলা হয়েছে, সড়কের নকশা পর্যালোচনা করা হয়নি।

রাটিং সমস্যার সমাধানে গত বছর বুয়েটের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. মো. জাকারিয়াকে পরামর্শক নিয়োগ করা হয়। তিনি সরেজমিন পরিদর্শন করে সমস্যা সমাধানে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেন। সওজের তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী কাজী শাহারিয়া হোসেনকে এ প্রতিবেদন অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা নিতে চিঠি দেওয়া হলেও তা নেওয়া হয়নি।

গত জুলাইয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আবদুল মালেক প্রকল্প এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করেন। তিনি সভায় বলেন, ৩৮ কিলোমিটার সড়কের দুটি প্যাকেজের কাজ ভালো হলেও সাত কিলোমিটার অংশে ‘ওয়েরিং কোর্সে’র ওপর ‘রাটিং’ দৃশ্যমান হয়েছে, যা খুবই উদ্বেগজনক।

সভায় সওজের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (কারিগরি সার্ভিস উইং) ড. আবদুল্লাহ আলম মামুন বলেন, যে কোনো নকশা পর্যালোচনা করা উচিত। তা মাঠ পর্যায়ে কাজের উপযোগী না হলে সঙ্গে সঙ্গে রোড ডিজাইন ও সেফটি সার্কেলকে জানানো উচিত। অথচ সমস্যা দেখা দেওয়ার পর সমাধানের জন্য আসেন প্রকল্পসংশ্নিষ্টরা। ‘রাটিং’ সমস্যা দেখা দিলে ফুলে উঁচু হয়ে যাওয়া অংশ মিলিং মেশিন দিয়ে কেটে উপযুক্ত উপকরণ ব্যবহার করে সমাধান করতে হবে।

তবে সওজের যশোর বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এসএম মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, মন্ত্রণালয় নকশায় ত্রুটি পেয়েছে কিনা, তা তিনি জানেন না। সভার সিদ্ধান্ত এখনও জানেন না। তিনি জানান, সড়ক বেহাল হয়েছে অতিরিক্ত পণ্যবাহী যান চলাচলের কারণে। অতিরিক্ত পণ্যবাহী গাড়ি ঠেকাতে সড়কের প্রবেশমুখে স্থায়ী ‘এক্সেল লোড’ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র প্রয়োজন। অতিরিক্ত পণ্যবাহী যান চলাচল বন্ধ না হলে যত ভালো রাস্তাই বানানো হোক, তা টিকবে না।

 

২৪ ফুট প্রশস্ত দুই লেনের যশোর-খুলনা জেলা সড়ককে ৩৪ ফুট চওড়া চার লেনের জাতীয় মহাসড়কে উন্নীত করার কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের মে মাসে। প্রকল্পের ঠিকাদার মাহবুব অ্যান্ড ব্রাদার্স এবং তমা কনস্ট্রাকশন। আগামী জুনে এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে। এ পর্যায়ে এসে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধন করতে বলেছে মন্ত্রণালয়। পর্যালোচনা সভায় সিদ্ধান্ত হয়, সমস্যা সমাধান না করে প্রকল্প সমাপ্ত করা হবে না। ফলে সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি নিশ্চিত। সংশোধিত ডিপিপিতে ব্যয় ৫০ কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। অর্থাৎ, নিশ্চিতভাবেই প্রকল্প ব্যয় ৩৭০ কোটি টাকায় দাঁড়াবে।

 

সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, সড়কের প্রবেশমুখে স্থায়ী এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র স্থাপনের আগ পর্যন্ত অতিরিক্ত পণ্যবাহী যান চলাচল বন্ধে জরুরি ভিত্তিতে বহনযোগ্য ওয়ে স্কেল স্থাপন করতে হবে। অতিরিক্ত মাল বহনকারী যানবাহনকে জরিমানা করতে হবে। ভবিষ্যতে দুই পাশে ধীরগতির যান চলাচলে সার্ভিস লেনের জন্য জায়গা রেখে ডিপিপি সংশোধন করতে হবে। পরামর্শকের নির্দেশনা অনুযায়ী ‘রাটিং’ মেরামত করতে হবে। সড়কের দুই পাশে হার্ড শোল্ডার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সওজের কারিগরি সার্ভিস উইং সাত দিনের মধ্যে সরেজমিন পরিদর্শন করে পুনঃনকশা করবে।

 

সভায় সিদ্ধান্ত হয়, প্রকল্পটির সমীক্ষা, নকশা ও ডিপিপি প্রণয়নে যারা সংশ্নিষ্ট ছিলেন, তাদের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হবে। কোনো নতুন সড়কে রাটিং হলে এর জবাব দিতে হবে তাদের।

 

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, নকশা প্রণয়নে ২০১৪ সালে দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবদুল আজিজ জোয়ার্দার, রোড ডিজাইন সার্কেলের তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কামরুল হক, একই সার্কেলের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, সহকারী প্রকৌশলী আতিয়া তনি। ২০১৬ সালে দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান ও সহকারী প্রকৌশলী মৌসুমী আক্তার।

 

ডিপিপি প্রণয়নের দায়িত্বে ছিলেন সেই সময়কার অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (প্ল্যানিং) আবুল কাশেম ভূঞাঁ, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (খুলনা জোন) রুহুল আমিন, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্ল্যানিং) রবিউল আলম ও খায়রুল ইসলাম খান, নির্বাহী প্রকৌশলী মাহাদি ইকবাল ও ফাহমিদা হক খান, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আলি নুর এইন ও সৈয়দা শাহানা নাজনীন।

 

পর্যালোচনা সভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সওজের প্রধান প্রকৌশলী আবদুস সবুর এবং অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (খুলনা জোন) সৈয়দ আসলাম আলীকে। নিম্নমানের কাজের অভিযোগ নাকচ করেছেন আসলাম আলী। তিনি বলেছেন, নকশায় ভুল থাকতে পারে। নকশা সংশোধন একটি চলমান প্রক্রিয়া। কিন্তু জেনেবুঝে কোনো প্রকৌশলী খারাপ কাজ করেননি। ৩৮ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে শুধু নোয়াপাড়ার পাঁচ-ছয় কিলোমিটার অংশ খারাপ। এর কারণ অতিরিক্ত পণ্যবাহী যান চলাচল। আরেকটি কারণ নকশায় বিটুমিনের যে পুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তা কম হয়ে থাকতে পারে। কিংবা বিটুমানে ত্রুটি থাকতে পারে। এর কিছুই ইচ্ছাকৃত ছিল না।

আরও পড়ুন