নিয়ন্ত্রণহীন সাইবার অপরাধ

নিয়ন্ত্রণহীন সাইবার অপরাধ

সাইবার থানা, ভুক্তভোগী ৬৭.৯ শতাংশ নারী, সিআইডিতেই প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০টি অভিযোগ

বগুড়ায় ২০ জন নারী ও কিশোরীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তাদের আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ধারণ করে তানজিমুল ইসলাম রিয়ন (২২) নামের এক কলেজছাত্র। পরে সেই ছবি ও ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে টাকা ও গয়না হাতিয়ে নেয় অভিযুক্ত রিয়ন। সম্প্রতি বগুড়া পুলিশের সাইবার ইউনিটের একটি দল এক ভুক্তভোগীর মায়ের করা পর্নোগ্রাফি মামলায় রিয়নকে গ্রেফতার করে। জানা যায়, ভিডিওকলের মাধ্যমে অন্তত ২০ জনের আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও রিয়ন তার মেসেঞ্জারে সংরক্ষণ করে।

 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পুলিশ, র‌্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার কাছে প্রতিদিন নারী ও শিশুদের হয়রানির অভিযোগ সবচেয়ে বেশি আসে। ভুয়া আইডি খুলে এই হয়রানি করা হয় দেশ ও বিদেশ থেকে। এর ফলে নারী ও কিশোরীরা প্রতারণার শিকার হচ্ছে। প্রেমের ফাঁদে ফেলে ছবি তুলে ছড়িয়ে দেওয়া হয় সাইবার জগতে। অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করেও লাভ হয় না। কারণ অপরাধীরা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। সংশ্লিষ্টরা জানান, দিনকে দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে দেশের সাইবার অপরাধীরা।

 

এ জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছেও জমা হচ্ছে সাইবার অপরাধ-সংক্রান্ত অভিযোগের স্তূপ। অথচ সাইবার অপরাধ দমনে বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে গঠন করা হয়েছে সাইবার ইউনিটও। কিন্তু এর পরও কোনোভাবেই সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। পুলিশ সদর দফতরের হিসাবে দেশে এখন ১৩ ধরনের সাইবার অপরাধের ঘটনা ঘটছে। আর পুরুষের তুলনায় নারীরাই বেশি সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছেন। ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৬৭.৯ শতাংশই নারী। আশঙ্কার কথা, ভয়ঙ্কর এই অপরাধের শিকার হচ্ছেন সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা। শুধু পুলিশের ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টে (সিআইডি) প্রতিদিন গড়ে সাইবার অপরাধ-সংক্রান্ত ৫০ থেকে ৬০টি অভিযোগ জমা হচ্ছে। এ অবস্থায় পুলিশ বিভাগ থেকে অপরাধ দমনে বিশেষায়িত সাইবার থানা স্থাপনের জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব করা হয়েছে।

সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন গত বছর ‘বাংলাদেশে সাইবার অপরাধের প্রবণতা’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত তথ্যে, বর্তমানে ভার্চুয়াল জগৎ ব্যবহারকারীদের মধ্যে ১১ ধাপে অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। অনলাইনে পণ্য কিনতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন ৭.৪৪ শতাংশ মানুষ। আবার অনলাইনে কাজ দেওয়ার কথা বলে প্রতারণার শিকার হচ্ছে ১.৪০ শতাংশ ব্যবহারকারী। ছবি বিকৃত করে ১৫.৩৫ শতাংশ ব্যবহারকারীর ছবি অনলাইনে প্রচার করা হচ্ছে। অন্যদিকে পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত ৬.০৫ শতাংশ ব্যবহারকারী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ২২.৩৩ শতাংশ মানুষ অপপ্রচার চালাচ্ছেন। মোবাইল ব্যাংকিংয়ে অ্যাকাউন্ট হ্যাক বা তথ্য চুরি হচ্ছে ০.৪৭ শতাংশের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং ও তথ্য চুরি হচ্ছে ১৫.৩৫ শতাংশের। অনলাইনে ১৭.৬৭ শতংশ ব্যবহারকারীকে বার্তা পাঠিয়ে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া ১.৪০ শতাংশ ব্যবহারকারীর ভুয়া আইডি তৈরি হচ্ছে, ই-মেইলের মাধ্যমে তারা প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। সাধারণত ১৮ থেকে শুরু করে ৩০ বছর বয়সীরাই সাইবার অপরাধের শিকার বা ভুক্তভোগী। সাইবার অপরাধে ভুক্তভোগী বেশির ভাগ নারীই (১৬.৩ শতাংশ) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচারের শিকার। এ ছাড়া ১৪ শতাংশ নারী অনলাইনে পাঠানো বার্তায় হুমকি পান। ১১.২ শতাংশ নারীর ছবি বিকৃত করে অনলাইনে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। কিন্তু হয়রানির শিকার হয়েও ৮০.৬ শতাংশ নারী আইনের আশ্রয় নিচ্ছেন না। ভুক্তভোগীরা জানান, অভিযোগ করে লাভ হবে না কিংবা বিষয়টি গোপন রাখতে হুমকি, হয়রানির ভয় এবং সামাজিক ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য তারা আইনের আশ্রয় নিচ্ছেন না। পুলিশ সদর দফতরের হিসাবে, দেশে সাধারণত ১৩ ধরনের সাইবার অপরাধের ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে রয়েছে পারিবারিক বিদ্বেষ সৃষ্টি, স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া, বন্ধুবান্ধবের মধ্যে বিরোধ তৈরি, উগ্র ও বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য প্রচার, ইউটিউবে অন্তরঙ্গ ভিডিও ও ছবি আপলোড, ফেক অ্যাকাউন্ট তৈরি, পাসওয়ার্ড বা গোপন নম্বর অনুমান করে আইডি হ্যাক, মোবাইল ব্যাংকিং, ই-কমার্স, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি, অনলাইন এমএলএম (মাল্টি লেভেল মার্কেটিং), অনলাইনে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অনলাইন গ্যাম্বলিং (জুয়া)। বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সাইবার অপরাধ দমনের জন্য বাংলাদেশের যে প্রস্তুতি থাকার কথা ছিল তা নেই। একই সঙ্গে এ জন্য পর্যাপ্ত রিসোর্স, দক্ষ জনবল এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামোর দুর্দান্ত অভাব রয়েছে। সাইবার অপরাধকে মোকাবিলা করার জন্য যথেষ্ট সক্ষমতাও নেই। পুলিশ বিভাগ, সিআইডি এ-সংক্রান্ত কার্যক্রম দেখছে। কিন্তু এদের সাইবার অপরাধ নিয়ে বিশেষায়িত প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম উন্নত করার কাজ আরও আগে করা উচিত ছিল। তাদের মতে, সাইবার অপরাধ দমনে দরকার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। তাহলে কমবে সাইবার অপরাধ। এ ব্যাপারে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদেরও সতর্ক থাকতে হবে।

 

সিআইডির প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মাহবুবুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সাইবার থানা করার জন্য আমরা একটি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব পাঠিয়েছি। এটি অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। সাইবার অপরাধ দমনে এ ধরনের থানা নির্মাণের প্রয়োজন অনুভব করছি। আশা করছি সরকার এর অনুমোদনে ইতিবাচক মনোভাব দেখাবে। ’ তিনি বলেন, ‘এখনো ভুক্তভোগী যারা সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছেন, তারা স্থানীয় থানায় গিয়ে সাহায্য চাইছেন। কিন্তু সাধারণ থানায় কর্মরত সব পুলিশ সদস্য প্রযুক্তিগত বিষয়ে দক্ষ নন। প্রাথমিকভাবে আমরা একটি সাইবার থানা দিয়ে যাত্রা শুরু করছি। পরবর্তী সময়ে দেশের অন্য বিভাগেও সাইবার থানা স্থাপন করা হবে। বর্তমানে আমাদের যে সদস্যরা সাইবার অপরাধ নিয়ে কাজ করছেন, তারা প্রায় সবাই বিদেশে এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। সাইবার থানা করা হলে সেখানে এই প্রশিক্ষিত পুলিশ সদস্যরাই কাজ করবেন। ’ ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদ বলেন, ব্যাংকিং সংক্রান্ত হ্যাকিংয়ের ঘটনা এড়াতে ব্যক্তিগত পর্যায়ে ব্যবহারকারীদের কখনই তার পাসওয়ার্ড শেয়ার করা উচিত নয়। এ ছাড়া পারসোনাল আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (পিন) বা অনলাইন ট্রানজেকশনের পাসওয়ার্ডও কাউকে জানানো যাবে না। আর্থিক প্রতিষ্ঠান লেভেলে প্রতিষ্ঠানগুলোর আইটি ফায়ার ওয়াল শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৬ সালের মে মাসে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আইটি ফায়ার ওয়াল শক্তিশালী করার নির্দেশ দিয়েছে। প্রতিটি ব্যাংকের সিকিউরিটি অপারেশন সেন্টার খোলারও নির্দেশ দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু সেই প্রজ্ঞাপনটি এখনো মানা হচ্ছে না। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংক আবার আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকগুলোতে আইটি সিকিউরিটি অডিট করার জন্য প্রজ্ঞাপন জারি করে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো এই নির্দেশনা মানছে কিনা তা নজরদারি করার দায়িত্বও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। প্রতিনিয়ত বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে হ্যাকিং হচ্ছে। এ জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনামা পালন করছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে হবে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকেও প্রতিনিয়ত তাদের আইটি ফায়ার ওয়াল ঠিক আছে কিনা তা দেখতে হবে। তা না হলে এই আইটি ফায়ার ওয়াল ভেঙে কাস্টমার কনফিডেনশিয়ালিটির তথ্য হ্যাকাররা নিয়ে নেবে। পরে হ্যাকিং করে গ্রাহকের টাকাও তুলে নেবে তারা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বলেন, ‘অপরাধের ক্ষেত্রে সাইবার অপরাধ আমাদের দেশে নতুন ট্রেন্ড। দেশে অপরাধের তিনটি চ্যালেঞ্জ লক্ষ করেছি। এগুলো হচ্ছে জঙ্গিবাদ, মাদক আর তৃতীয়টি সাইবার অপরাধ। এরই মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশে সাইবার বিষয়ে কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন লোকবল তৈরি হয়েছে। তরুণদের অনেকেই প্রতিবেশী দেশের ওয়েবসাইট হ্যাক করে ফেলছে। আর এ ধরনের রিসোর্স থাকার অর্থই হচ্ছে তারা কমবেশি সাইবার অপরাধেও জড়িয়ে পড়বে। ’ তিনি বলেন, বর্তমানে জীবনব্যবস্থাও অনেকটা অনলাইনকেন্দ্রিক হয়ে পড়ায় সাইবার অপরাধের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানবাধিকারকর্মী ও নারীনেত্রী খুশি কবীর বলেন, যখন একজন পুরুষ মনে করে যে তার মধ্যে দুর্বলতা আছে, তখন সে দুর্বলতাটিকে অতিক্রম করার জন্য নারীর প্রতি হিংস্র আচরণ করে। এখনকার সময় খুব সহজে নিজেকে আড়াল রেখে সাইবার অপরাধ করা হচ্ছে। আশির দশকে একজন নারীকে কোনো দুর্বৃত্ত প্রেমের প্রস্তাব দিলে আর সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে সেই নারীর দিকে অ্যাসিড ছুড়ে মারা হতো। কিন্তু এখন কিছু পুরুষ সামাজিক বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমে সংশ্লিষ্ট নারীর আপত্তিকর ছবি ছড়িয়ে তা ভাইরাল করে প্রতিশোধ নিচ্ছে। তিনি বলেন, সাইবার অপরাধের শিকার ভুক্তভোগী নারীকে মানসিকভাবে শক্ত হতে হবে। এখানে তার লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই।

আরও পড়ুন