অনলাইনে চটকদার অফারে যেভাবে চলে প্রতারণা

অনেক নকল ফেসবুক পেজ আছে, যেগুলোর কাজ হলো বাহারি সব পোশাকের ছবি তুলে বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া। ছবিগুলো গুগল ও অন্যসব পেজ থেকে ডাউনলোড করে পেজের অ্যাডমিনরা। নামিদামী নকশার পোশাকগুলোর মধ্যে লিখে দেয় অবিশ্বাস্য মূলছাড়। আসতে থাকে একের পর এক অর্ডার। ক্রেতারা হুমড়ি খেয়ে পড়েন ইনবক্সে। এরপর এক শ্রেণির ক্রেতা বিশ্বাস করে দিয়ে দেন অগ্রিম পেমেন্ট। টাকা দেওয়ার পর দেখা গেলো ব্লক করে দেওয়া হয় ওই ব্যক্তিকে। আবার দেখা যায় পণ্য পাঠালেও ছবির সঙ্গে মিল থাকে না সেটার। প্যাকেটের ভেতরে থাকে ছেঁড়া-ফাটা কিংবা পুরনো কাপড়। বিশেষ করে নারীদের পোশাক ও কসমেটিকসেই এমন প্রতারণা ঘটছে অহরহ।

 

দেড় বছর ধরে একটি চক্র এ ধরনের প্রতারণা করে আসছিল। অবশেষে ভুক্তভোগী এক নারীর দায়ের করা মামলায় এক দম্পতিসহ গ্রেফতার হয়েছে একটি গ্রুপ। তাদের বিরুদ্ধে হাতিরঝিল থানায় মামলা হয়েছে।

 

যেভাবে হতো প্রতারণা

 

অনলাইনে প্রতারিত হয়ে মিতু বসাক নামে এক নারী চিকিৎসক থানায় মামলা করেন। অভিযোগে বলেন-গত ২০ এপ্রিল তার নিজের ফেসবুক আইডির নিউজ ফিডে ‘ললনা ফ্যাশন’ নামে একটি পেইজের শাড়ির বিজ্ঞাপন দেখতে পান। শাড়ি কিনতে তিনি ২০ এপ্রিল ওই পেজে মেসেজ করেন। ওই দিন সকাল ১১টার দিকে তার বিকাশ একাউন্ট-এর মাধ্যমে পেজের কর্মীদের কথা অনুযায়ী ১০০ টাকা পাঠান। পরদিন এসএ পরিবহনের কাকরাইল শাখা হতে দুই হাজার পঞ্চাশ টাকা দিয়ে পার্সেল রিসিভ করেন তিনি। বাসায় এনে প্যাকেট খুলে দেখেন অর্ডারের সঙ্গে মিল নেই পণ্যের। দেওয়া হয়েছে নিম্নমানের একটি শাড়ি। যার দাম হবে বড়জোর চার শ’ টাকা।

 

গোয়েন্দা জালে স্বামী-স্ত্রীসহ তিনজন

 

মামলা দায়েরের পর রাজধানীর গেন্ডারিয়া এলাকা থেকে গত ২৩ মে এক দম্পতিসহ তিনজনকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। তারা হলেন- মোহাম্মদ ওয়াদুদ হোসেন, খাদিজা আক্তার রুপা ও তাদের সহযোগী তানিম আল ইমরান।

 

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, প্রতারকরা কয়েক ধাপে প্রতারণা করতেন। অনলাইনের বিভিন্ন পেইজ হতে পণ্যের ছবি ডাউনলোড করে সেটার গায়ে দাম বসাতেন ওয়াদুদ। এরপর বিভিন্ন ফেক পেইজে শাড়িসহ আরও অনেক পণ্যের বিজ্ঞাপন দেন তিনি। পণ্য ক্রয় করতে আগ্রহী ক্রেতাদের কাছ থেকে বিভিন্ন অনলাইন ট্রানজেকশন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ডেলিভারি চার্জ হিসাবে অগ্রিম ১০০-১৫০/- টাকা নিতেন।

 

এরপর অর্ডারকৃত পণ্যের বদলে কেনা হতো নিম্নমানের পণ্য। সেটাকে প্যাকিং করে শর্ত সাপেক্ষে কুরিয়ার করতো তারা। ক্রেতারা কুরিয়ার সার্ভিসকে টাকা পরিশোধ করেই গ্রহণ করতেন পণ্যটি। বাসায় নেওয়ার আগে বোঝার উপায় নেই ওই প্যাকে কী আছে। ডেলিভারি দেওয়ার পর অনলাইন পেইজটি ওই ক্রেতাকে ব্লক করে দেয়।

 

ক্রেতাদের বিশ্বাস অর্জনের জন্য খাদিজা আক্তার রুপা পেজের কাস্টমার কেয়ার প্রতিনিধি হিসেবে আগ্রহী ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলেন ও নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করেন। ডেলিভারি চার্জের টাকাও গ্রহণ করেন তিনি।

 

তানিম আল ইমরান পেশায় ছাত্র। পাশাপাশি বিভিন্ন পেজের বুস্টিং-এর কাজ করেন তিনি। প্রতারণামূলক এসব পেজে বুস্টিংয়ের জন্য তিনি প্রতি ডলার ১০৩ টাকা হারে নিতেন।

 

জানা গেছে, মোহাম্মদ ওয়াদুদ হোসেন আগে কনস্ট্রাকশনের কাজে জড়িত ছিলেন। পরে করোনার কারণে ব্যবসায় লোকসান হওয়ায় প্রতারণার পথ বেছে নেন তিনি।

 

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা-সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ) মুহাম্মদ শরীফুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চক্রটি মূলত করোনার সময় প্রতারণা করে আসছিল। এ সময়ে মানুষ বেশি অনলাইন নির্ভর হওয়ায় তারা সুযোগটা নিয়েছে। চক্রটির বিরুদ্ধে ডিজিটাল আইনে মামলা হয়েছে। আমরা তদন্ত করছি।’

 

তিনি জানান, অনলাইনে ভালো ই-কমার্স সাইটও রয়েছে। তাই কেনাকাটা করার আগে ওই পেজের আগের পোস্ট ও কমেন্ট যাচাই করার পরামর্শ দেন তিনি।

টুয়েন্টিফোর বাংলাদেশ নিউজ/এসকে
আরও পড়ুন