রেকর্ড গড়া জয়ে বিশ্বকাপের মূলপর্বে বাংলাদেশ

এবারের ৭ম আইসিসি ম্যানস টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ঠিক বাঁচা-মরার ম্যাচ না হলেও মূলপর্ব তথা সুপার টুয়েলভের ভাগ্য নিজেদের হাতে রাখতে জয়ের বিকল্প ছিল না। এমন ম্যাচে অলরাউন্ড নৈপুণ্যে আলো ছড়ালেন সাকিব আল হাসান। ঝড়ো ব্যাটিংয়ে আসরের দ্রুততম ফিফটি করলেন মাহমুদউল্লাহ। বোলারদের প্রায় সবাই রাখলেন অবদান। পাপুয়া নিউ গিনিকে উড়িয়ে পরের ধাপ নিশ্চিত করল বাংলাদেশ। অথচ আজ নিজেদের প্রথম পর্বের শেষম্যাচে প্রয়োজন ছিল মাত্র ৩ রানের জয়। নাহলে আবারও সমীকরণের জটিলতায় পড়তে হতো। কিন্তু সুপার টুয়েলভে যাওরার পথে এসবের কোনো সুযোগই রাখলেন না সাকিব-মাহমুদউল্লাহরা। শক্তিতে অনেক পিছিয়ে থাকা দলটির বিপক্ষে ৮৪ রানে এসেছে বিশাল জয়। এর মাধ্যমেই সুপার টুয়েলভ নিশ্চিত করে ফেলল টিম টাইগার।

 

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে ৮৪ রানের বিশাল ব্যবধানে জয় পেল বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। এই জয়ে বিশ্বকাপের মূল পর্বের টিকিট নিশ্চিত করল বাংলাদেশ। এর আগে টি-টোয়েন্টিতে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে সর্বোচ্চ ৭১ রানের ব্যবধানে জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ। ওমানের মাসকাটের আল আমেরাত ক্রিকেট গ্রাউন্ডে টস জিতে প্রথমে ব্যাট করে ৭ উইকেট হারিয়ে ১৮১ রান করে বাংলাদেশ। জবাবে পাপুয়া নিউগিনি সবকটি উইকেট হারিয়ে ৩ বল বাকি রেখে মাত্র ৯৭ রান করতে সক্ষম হয়। যদিও শুরুটা ভালো হয়নি। ইনিংসের দ্বিতীয় বলে স্কোরবোর্ডে কোনো রান যোগ হওয়ার আগেই কাবুয়া মোরিয়ার বলে ফ্লিক করতে গিয়ে মিডউইকেটে সিসি বাউয়ের তালুবন্দি হয়ে ফিরে যান মোহাম্মদ নাঈম (০)। এরপর দলের হাল ধরার চেষ্টা করেন লিটন দাস এবং সাকিব আল হাসান। দুজনের সাবলীল ব্যাটিংয়ে পাওয়ারপ্লেতে আসে ৪৫ রান। যেখানে আগের দুই ম্যাচে যথাক্রমে ২৫ ও ২৯ রান এসেছিল। দুজনের জুটি যখন জমে গেছে, তখনই ছন্দপতন। ২৩ বলে ১ চার ১ ছক্কায় তার ২৯ রানের ইনিংস থামে আসাদ ভালার বলে স্লগ সুইপ করতে গিয়ে ডিপ মিডউইকেটে সিসি বাউয়ের তালুবন্দি হয়ে। এরই সঙ্গে ভাঙে ৫০ রানের ওপেনিং জুটি। সাকিবের সঙ্গী হন মুশফিক। কিন্তু ফর্মহীনতায় ভোগা মুশফিক (৮ বলে ৫) ব্যর্থ। সাইমন আতাইয়ের করা ১১তম ওভারেরর দ্বিতীয় বলে পুল করতে গিয়ে ডিপ স্কয়ার লেগে ক্যাচ দেন। দুইবারের চেষ্টায় ক্যাচ তালুবন্দি করেন হিরি হিরি। বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান বেশ মেজাজে ছিলেন। হাত খুলে মারার যে নির্দেশনা ছিল, তা পালন করার চেষ্টা করেন। তার ৩৭ বলে ৪৬ রানের ইনিংসে কোনো বাউন্ডারি না থাকলেও ছিল ৩টি ছক্কার মার। আসাদ ভালার করা ১৪তম ওভারে সাকিবের তুলে দেওয়া ক্যাচটি দুর্দান্তভাবে তালুবন্দি করেন চার্লস আমিনি। আগের বলেই ছক্কা মেরেছিলেন সাকিব। উইকেটে এসেই মারমুখী মেজাজে ধরা দেন মাহমুদউল্লাহ। তার সঙ্গী হন তরুণ আফিফ। মাত্র ২৭ বলে ৩ চার ৩ ছক্কায় ক্যারিয়ারের ৬ষ্ঠ ফিফটি তুলে নেন মাহমুদউল্লাহ। চলতি আসরে এখন পর্যন্ত এটাই দ্রুততম ফিফটি। দারুণ ব্যাটিংয়ে এবারের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের রেকর্ডবইও খুললেন মাহমুদউল্লাহ। মাত্র ২৭ বলে তুলে নিলেন হাফসেঞ্চুরি। যা কিনা এবারের আসরে কোনো ব্যাটসম্যানের দ্রুততম ফিফটির রেকর্ড। এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দ্রুততম ফিফটির রেকর্ডটি ছিল ডেভিড ওয়াইজের। নামিবিয়ার এই ব্যাটার গত বুধবার নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ২৯ বলে হাফসেঞ্চুরি ছুঁয়েছিলেন। অবশ্য ড্যামিয়েন রাভুর করা পরের বলেই তিনি সোপারের তালুবন্দি হয়ে ফিরেন। শেষদিকে আফিফ হোসেনের ১৪ বলে ৩ চারে ২১ আর মোহাম্মদ সাইফউদ্দিনের ৬ বলে ১৯* রানের ক্যামিওতে নির্ধারিত ২০ ওভারে বাংলাদেশের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৭ উইকেটে ১৮১ রান। ২টি করে উইকেট নিয়েছেন কাবুয়া মোরিয়া, ড্যামিয়েন রাভু এবং আসাদ ভালা। ১টি নিয়েছেন সাইমন আতাই।

 

দলের হয়ে ২৮ বলে ৩ চার ও তিন ছক্কায় সর্বোচ্চ ৫০ রান করেন অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। এছাড়া ৩৭ বলে তিন ছক্কায় ৪৬ রান করেন সাবেক অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। ২৩ বলে এক চার ও এক ছক্কায় ২৯ রান করে ২৯ রান করেন ওপেনার লিটন দাস। ১৪ বলে ২১ রান করেন আফিফ হোসেন। ইনিংসের শেষ ওভারে রীতিমতো তান্ডব চালান মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন। শেষ ওভারেই ২০ রান আদায় করে নেয় বাংলাদেশ। সাইফউদ্দিন মাত্র ৬ বলে এক চার আর দুই ছক্কায় করেন অপরাজিত ১৯ রান। তার কারণেই পাপুয়া নিউগিনির বিপক্ষে ১৮১ রান তুলতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ। ১৮২ রানের বিশাল টার্গেট তাড়া করতে নেমে শুরু থেকেই উইকেট হারাতে থাকে পাপুয়া নিউগিনি। রান তাড়ায় নামা পাপুয়া নিউগিনির বিপক্ষে শুরুতেই পেসারদের নামিয়ে দেয় বাংলাদেশ। সাইফউদ্দিন আর মুস্তাফিজকে দিয়ে শুরু হয় আক্রমণ। ইনিংসের তৃতীয় ওভারেই ব্রেক থ্রæ উপহার দেন মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন। তার বলে এলবিডব্লিউ হয়ে সাজঘরে ফেরেন পাপুয়া নিউগিনির ওপেনার লিগা সিকা। চতুর্থ ওভারে বোলিংয়ে এসেই সাফল্য পান তাসকিন আহমেদ। তার দ্বিতীয় বলে শিকার হয়ে ফেরেন পাপুয়া নিউগিনির অধিনায়ক আসাদ ভালা। পঞ্চম ওভারে বোলিংয়ে এসে পাপুয়া নিউগিনি শিবিরে জোড়া আঘাত হানেন সাকিব আল হাসান। তার শিকার হয়ে ফেরেন চার্লস আমিনি ও সাইমন আতাই। নবম ওভারে বোলিংয়ে এসে সাকিব ফেরান সিস বাউকে। ৯.২ ওভারে দলীয় ২৫ রানে ষষ্ঠ ব্যাটসম্যান হিসেবে নরম্যান ভানুয়াকে ফেরান অফ স্পিনার মেহেদি হাসান। ইনিংসের ১১তম ওভারে বোলিংয়ে এসে হিরি হিরিকে সাজঘরে ফেরান সাকিব।

 

এদিন ৪ ওভারে মাত্র ৯ রানে ৪ উইকেট শিকার করেন এই অলরাউন্ডার। চলতি বিশ্বকাপে এটাই সেরা বোলিং ফিগার। এদিন ৪ উইকেট শিকারের মধ্য দিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে রেকর্ড ৩৯ উইকেট শিকার করা পাকিস্তানের কিংবদন্তি শহীদ আফ্রিদীকে ছুঁয়ে ফেলেন সাকিব। দলীয় ৫৪ রানে অষ্টম ব্যাটসম্যান হিসেবে চাদ সোপারকে আউট করে সাইফউদ্দিন। ১৭.৪ ওভারে দলীয় ৮০ রানে রান আউট হয়ে নবম ব্যাটসম্যান হিসেবে ফেরেন কবুয়া মোরিয়া। পাপুয়া নিউগিনি শিবিরে শেষ পেরেকটি মারেন তাসকিন আহমেদ। ড্যামিয়েন রাভুর বিদায়ের মধ্য দিয়ে ১৯.৩ ওভারে ৯৭ রানে আলআউট হয় পাপুয়া নিউগিনি। প্রথম ম্যাচে স্কটল্যান্ডের কাছে ৬ রানে হেরে কিচুটা আতঙ্ক ভর করেছিল; কিন্তু দ্বিতীয় ম্যাচেই ওমানকে ২৬ রানে হারিয়ে ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। শেষ ম্যাচে পাপুয়া নিউগিনিকে ৮৪ রানের বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সুপার টুয়েলভ নিশ্চিত করলো মাহমুদউল্লাহ রিয়াদরা। টি-টোয়েন্টিতে নিজেদের ইতিহাসে বাংলাদেশ তুলে নিলো সবচেয়ে বড় জয়। স্কটল্যান্ড ও ওমানের বিপক্ষে আশানুরূপ ব্যাটিং করতে পারেনি বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। প্রথম ম্যাচে ১৩৪ ও পরেরটিতে দলীয় সংগ্রহ হয় মাত্র ১৫৩ রান। তবে গতকাল প্রথম পর্বের শেষ ম্যাচে পাপুয়া নিউগিনির বিপক্ষে ১৮১ রানের বড় সংগ্রহই দাঁড় করিয়েছে টাইগাররা। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সাত আসরে এটিই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ। বিশ্বকাপে এতদিন ধরে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ ছিলো ওমানের বিপক্ষে করা ২ উইকেটে ১৮০ রান। ২০১৬ সালের আসরে তামিম ইকবালের সেঞ্চুরিতে ভর করে ওমানের বিপক্ষে এই রান করেছিল বাংলাদেশ। সেটি এবার নেমে গেলো দুইয়ে।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ

১৮১/৭ বনাম পাপুয়া নিউগিনি (২০২১)

১৮০/২ বনাম ওমান (২০১৬)

১৭৫/৬ বনাম পাকিস্তান (২০১২)

১৬৫/৪ বনাম ওয়েস্টইন্ডিজ (২০০৭)

১৫৬/৫ বনাম অস্ট্রেলিয়া (২০১৬)।

টুয়েন্টিফোর বাংলাদেশ নিউজ/বরকতউল্লাহ
আরও পড়ুন